ত্যাগীরা হলের বাইরে, ভেতরে হলভর্তি হাইব্রিড

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on print

নিজস্ব প্রতিবেদক :::

কথা ছিলো দলের চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে দলের তৃণমূলের সমাবেশ ; শেষ পর্যন্ত অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিডদের ছড়াছড়িতে শেষ নগরীর হয়েছে হোটেল রাডিশনের সভাটি। রবিবার রাতে পূর্ব নির্ধারিত এই সভার বাইরে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে বিএনপি – অংশ সংগঠনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম শহরের একটি অভিজাত হোটেরের হলরুমে নির্বারিত সভাটিতে যোগ দেবার কার্ড পান নি দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এই নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে নগর যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক বাদশা, মনোয়ারা বেগম মনিসহ অনেক পরিচিত মুখকে। তবে বাদশা কার্ড পেয়েছিলেন তিনি সভা বয়কট করেছেন যুবদলের ত্যাগ নেতাকর্মীদের ডেলিগেশন তালিকা থেকে বাদ দেবার প্রতিবাদে।

ভেতরে সভা অনুষ্ঠিত হলেও দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে না পারার ক্ষোভের আগুন জ্বলছে হোটেল রাডিশনের বাইরে। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী  ব্যবসায়ী, সনাতন ধর্মাবলম্বী সাংবাদিক, যুবলীগ, সৈনিক লীগের অনেক নেতাকর্মীদের হলের ভেতরে কার্ড ঝুলিয়ে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। 

সুত্রমতে, দশ হাজার টাকা করে বিক্রি হয়েছে ডেলিগেশন কার্ড। নগর বিএনপির আহবায়ক কমিটির তিনজন নেতা টাকা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভার কার্ড বিক্রি করেছেন। 

মোবারক হোসেন নামের এক কর্মী ফেসবুকে লিখেছেন, ” চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রীর সাথে তৃণমূলের মত বিনিময় সভার কার্ড কেনাবেচা হইছে। যে বেশি টাকা দিছে সে কার্ড পাইছে। দলীয় মিটিংয়ে অংশগ্রহণের কার্ডও যে বেচাকেনা হয় প্রথম দেখলাম। “

মোহাম্মদ নুরুল হুদা নামের আরেক কর্মীকেও আক্ষেপের সাথে ডেলিগেশন কার্ড বাণিজ্যের প্রতিবাদ করতে দেখা যায়।

ক্ষোভ জানিয়ে স্টাটাস দিয়েছেন নাসির উদ্দীন চৌধুরী নাসিম নামের আরেক কর্মী। লিখেছেন, চট্টগ্রাম মহানগর আওতাধীন বিভিন্ন ওয়ার্ড গুলোতে স্থান পাওয়ারা বেশির ভাগ নেতাদের অনুগত হাইব্রিড, শুধুমাত্র নেতারা নিজেদের বলয় তৈরি করতে ত্যাগীদের কোরবানি দিয়েছিলেন, এই সুযোগ নিয়ে আজ আবারো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাংগঠনিক সভায় ত্যাগীদের বাদ দিয়ে হাইব্রিড এবং নিজেদের পছন্দের মানুষের মধ্যে ডেলিগেট কার্ড বিতরণ করে প্রমাণ করলেন, তারা দল নয়, নিজেদের বলয় তৈরি করতে ব্যস্ত।

সভায় উপস্থিতি কার্ড না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আলী মুর্তজা খান। অভিমান ও আক্ষেপ নিয়ে ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন — “দলের দুঃসময়ে ৭০০ জনের জায়গায় ৭ জন পেতাম না মিটিং, মিছিল, হরতালে, এখন ৭০০ জন যারা কার্ড পেয়েছে তারা কারা?”

আরেকটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘দলের দুঃসময়ে যারা রাজপথে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন তাঁরা সবসময় অবহেলিত’।

এর পরেই তিনি আরেকটি ভিডিও বার্তা দেন। সেখানে ক্যাপশনে তিনি লেখেন— ‘‘স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে, তার চোখে-চোখ রেখে দলের দুঃসময়ে যদি আন্দোলন সংগ্রামে আমরা রাজপথে নেতৃত্ব দিতে পারি, ক্ষমতায় যারা হাইব্রিড, আত্মীয়করণ এবং আওয়ামীলীগ পূর্ণবাসনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, আপনাদের জন্য কি করতে পারি, এটা সময়ের অপেক্ষায় থাকেন’’।

তিন মিনিটের ওই ভিডিও বার্তায় তিনি আরো বলেন— ‘‘অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি এই কারণে, আমি মুর্তজা যে কি না চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ১২৫টি মামলার আসামি ছিলাম এবং সর্বোচ্চ সময় কারাগারে ছিলাম। আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন আমি প্যারোলে মুক্তি পেয়ে জানাজায় অংশ নিয়েছিলাম। জেলে থাকা অবস্থায় বহদ্দারহাটে পুলিশের সঙ্গে মারামারিতে আমাকে আসামি করা হয়। সেই আমি ৭০০ জনের সাংগঠনিক সভায় স্থান পেলাম না। এ দায় কে নেবে? এ দায় দায়িত্ব আজকে যারা মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন আপনাদেরকে নিতে হবে। ধিক্কার জানাই আপনাদেরকে’’।

তার এই অভিমান ও ক্ষোভের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি  বলেন, আমার মতো সর্বোচ্চ নির্যাতিত একজন যদি ইনভাইট না পায় তাহলে কিসের আর রাজনীতি করলাম? রেডিসন ব্লু আমাদের এলাকায় আমি এই এলাকায় রাজনীতি করছি তৃণমূল থেকে। অথচ আমি ঢুকতে পারছি না। এর চেয়ে লজ্জার আর কি থাকতে পারে! অথচ যাদের পদ পদবি ছিল না, দলের দুঃসময়ে যারা গা বাঁচিয়ে চলতো তারা কার্ড পেয়েছে। এ দায় আমি কাকে দিব? যেখানে আমি মূল্যায়িত হচ্ছি না সেখানে তৃণমূলের অবস্থাতো আরো খারাপ।

চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল আল হাসান সোনামানিক রেডিসন ব্লু হোটেলের সামনে বলেন, “আমি ৫৩টি মামলার আসামি ৯ বার জেল খেটেছি অথচ আমরাই ডেলিগেট কার্ড থেকে বঞ্চিত৷” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ব্যবসা বাণিজ্য চাইনি, আমরা শুধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্য চেয়েছিলাম কিন্তু আমাদের সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে৷”

প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানস্থল হোটেল রেডিসন ব্লু’র সামনে একাধিক নারী নেত্রীকেও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে৷ যাঁদের ভাষ্য, আমরা দলের জন্য মামলা হামলার শিকার হয়েছিলাম৷ দল থেকে কিছু চাইনি শুধু আজকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত থাকতে৷ কিন্তু আমাদেরকে সেখানে ঢোকার অনুমতি পর্যন্ত দেয়া হলো না৷

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিক্ষুব্ধ নেতা কর্মী বলেছেন, চট্টগ্রামের এক নেতার অনুসারিদেরকেই বেশীরভাগ ডেলিগেট কার্ড দেয়া হয়েছে৷ অথচ দীর্ঘদিন রাজপথে থেকে হামলা মামলার শিকার হওয়া নেতাকর্মীরা আজ অবহেলিত। কার্ড বিক্রি, স্বজনদের কার্ড দেয়া, ডেলিগেশন কার্ড নিয়ে  বৈষম্যের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে তদন্তের দাবি তাদের।

চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতবিনিময় সভার আগেই ডেলিগেট কার্ড বিতরণ নিয়ে এমন অসন্তোষ দেখা দিয়েছিলো। রবিবার বিকেলে কার্ড বিতরণে অনিয়ম, পছন্দের লোকদের প্রাধান্য এবং দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করার অভিযোগে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

রবিবার ( ৯ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু হোটেলের মেজবান হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ এই সভায় কারা অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তা নিয়ে দিনভর নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা ও ক্ষোভ চলে।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ডেলিগেট কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং দলীয় ফোরামে প্রয়োজনীয় আলোচনা করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা এবং বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হওয়া অনেক নেতাকর্মী সভায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

কার্ড না পাওয়া নেতাকর্মীদের একাংশের প্রশ্ন, দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সভায় তৃণমূলের প্রকৃত কর্মীদের বাদ দিয়ে যদি সুবিধাভোগী বা লোকদেখানো নেতাকর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের কাছে কী বার্তা যাবে? তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্তে শুধু হতাশাই বাড়বে না, সাংগঠনিক ঐক্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সভায় প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তে সাংগঠনিক অবদান, ত্যাগ, যোগ্যতা ও তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করা নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভবিষ্যতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

নেতাকর্মীদের আরও অভিযোগ, যারা দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয় থেকেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে মামলা, হামলা ও নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক আয়োজন থেকেও তাদের দূরে রাখা হলে তৃণমূলের ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।

বিষয়টি নিয়ে দলীয় উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হলে তৃণমূলের মতামত ও বাস্তব অবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে যোগ্য ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের মাধ্যমে সাংগঠনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তবে ডেলিগেট কার্ড বিতরণে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির একাধিক নেতার মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

আরো পড়ুন

আরাফাত রহমান কোকোর জন্মদিনে বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা

প্রেস বিজ্ঞপ্তি :: বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ ছেলে ও বাংলাদেশ ক্রিকেট...

Read more
যুবলীগ নেতা মঞ্জু গ্রেপ্তার

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি :: মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক সদস্য ও  ইউপি সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুকে (৩৮) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আজ...

Read more
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হলেন রাশেদ খাঁন

নিজস্ব প্রতিবেদক :: রাশেদ খাঁনকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহকারী (রাজনৈতিক) পদে সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের...

Read more
রাজধানীতে ১১ দলের সমাবেশ মঙ্গলবার

নিজস্ব প্রতিবেদক ::: গণহত্যার বিচারে ধীরগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগে মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ...

Read more
প্রতিটি প্রকল্প দৈনিক নজরদারিতে আনছে সরকার: আমির খসরু

নিজস্ব প্রতিবেদক :: উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকাতে প্রতিটি প্রকল্পকে দৈনিক নজরদারির আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থ...

Read more
Scroll to Top