রেলে ফজলে করিম যুগ, অধরা ফারাজ- শাহআলম

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on print

বিশেষ প্রতিনিধি :::

এক যুগের বেশি সময় রেলওয়ের সবকিছু শতভাগ  নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। আওয়ামী লীগের এই সংসদ সদস্য রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে  হাজার কোটি টাকার  দুর্নীতি করলেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়। ভারত পালিয়ে যাবার সময়  আখাউড়া সীমান্ত থেকে আটক হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। তবে  অসুস্থতার অজুহাতে বর্তমানে  ফজলে করিম চৌধুরী বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন আছেন।

চট্টগ্রামে রেলের ঠিকাদার শাহ আলম, যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, আইয়ুব আলীর সিন্ডিকেটকে  পেশীশক্তি হিসেবে গড়ে তুলে রেলখাত  হাতের মুঠোয় রেখেছিলেন ফজলে করিম চৌধুরী। বর্তমানেও সেই  শাহআলম বহাল তবিয়তে ব্যবসা করছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে।

বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যাবহার করে বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে বড় বড় প্রজেক্ট হাতিয়ে নেওয়া, বিনা প্রতিযোগিতায় ডিপিএম পদ্ধতিতে যন্ত্রাংশ সরবরাহের নামে হাজার কোটি টাকার অপরিসীম দুর্নীতি।  রেলের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে  সরাসরি ব্যবহার করেছেন নিজের ছেলে ও শ্যালককে।  চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর তিনবার রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন। আর এর মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়ে নানান অসুদপায় অবলম্বন করে বনে যান কোটি কোটি টাকার মালিক। নিজেকে পরিণত করেন রেলওয়ের নতুন কালো বিড়ালে।

ফজলে করিম চৌধুরীর উত্থানের পেছনের গল্প!

ফজলে করিম চৌধুরী ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হন। এরপর তিনি প্রথমবার বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রথমবার দায়িত্ব নেন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে দ্বিতীয়বার রেলপথ মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েও তৃতীয়বারের মতো একই মন্ত্রণালয়ের সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হন।

একাধারে দশ বছর রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দ্বায়িত্বে থাকাকালে তিনি রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যাবহার করে বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে বড় বড় প্রজেক্ট হাতিয়ে নেন এবং বিনা প্রতিযোগিতায় ডিপিএম পদ্ধতিতে যন্ত্রাংশ সরবরাহের নামে করেছেন হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি। এক্ষেত্রে তিনি সরাসরি ব্যবহার করেছেন তার ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী ও শ্যালক খান মোহাম্মাদ এহসানকে।

এই খান মোহাম্মদ এহসানের মালিকানাধীন মূল কোম্পানি হচ্ছে NGGL গ্রুপ (Next Generation Graphics Ltd)| NGGL গ্রুপের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করে দেখা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের আরো ২টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- (১) Fav Diesel Sales & Service এবং (২) Maximum Support Limited|

বাংলাদেশ রেজিট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) নিবন্ধন অনুসারে রেকর্ড পর্যালোচনা করে জানা যায়, ফারাজ করিম চৌধুরী ও তার মামা এহসানের মালিকানায় ফিফটি ফিটটি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নিবন্ধিত হয় কোম্পানি দুটি। ফারাজ ও তার মামা এহসানের মধ্য হওয়া একটি গোপন ব্যবসায়িক চুক্তির কপিও  হাতে এসেছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফারাজ দম্ভ করে বলতেন, তিনি নামে-বেনামে নয়, সরাসরি নিজ নামে DEUTZ Engine Germany এবং IRCON International India- এই দুটি কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসা করেন। বিদেশি দুই কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাবসা করার কথা ঘোষণা করলেও, সুকৌশলে তার ও তার মামার মালিকানাধীন দেশীয় দুটি অংশীদারিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের নাম গোপন রাখেন।

অনুসন্ধানে প্রমাণ পাওয়া যায়, ফারাজের বিদেশি প্রতিষ্ঠান Deutz Engine Germany ব্যবহার করে তাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠান Fav Diesel Sales & Service এর মাধ্যমে এবং IRCON International India ব্যবহার করে তাদের আরেক দেশীয় প্রতিষ্ঠান Maximum Support Limited এর মাধ্যমে ফজলে করিম চৌধুরীর সরাসরি প্রভাব প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা দেখিয়ে কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন। বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে ফারাজ ও এহসান ব্যবহার করেন ফজলে করিম চৌধুরীর সরাসরি হস্তক্ষেপ ও সর্বময় শক্তি।

জানা যায়, ফজলে করিম চৌধুরী সিন্ডিকেট দরপত্র আহ্বান না করে প্রতিযোগিতাহীন ডিপিএম পদ্ধতিতে যন্ত্রাংশের মূল্য কয়েকশ গুণ বাড়িয়ে কাজ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ওপর চালাতেন অত্যাচারের স্টিম-রোলার, দিতেন অমানষিক চাপ এবং অফিসিয়ালি করতেন অপমান-অপদস্ত ও অশ্রাব্য গালাগালি। সংশ্লিষ্ঠ কোনো রেলওয়ে কর্মকর্তা যন্ত্রাংশের প্রাক্কলিত মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করতে রাজি না হলে এবং ডিপিএম পদ্ধতিতে ক্রয় না করে খোলা দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ক্রয় করতে চাইলে, তার ওপর নেমে আসত অমানষিক নির্যাতন এবং পড়তেন ব্যাপক সামাজিক হেয় প্রতিপন্নের মুখে। শুধু তাই নয়, এসব রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ডাক পড়তো রেলপথ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় এবং স¦য়ং ফজলে করিম চৌধুরী সবার সামনে ও অন্যান্য রেল কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তাদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতেন।

ডিজিটাল ট্রেন ওয়াশিং প্ল্যান্টের দুর্নীতি 

ফজলে করিম চৌধুরীর সঙ্গে মেজর জেনারেল জিয়ার ছিল দীর্ঘদিনের অন্যরকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, যা তিনি ব্যবহার করেছেন তার রাজনৈতিক হত্যার মিশনে এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কাজে। তারই এক অনন্য উদাহরণ বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামানকে ব্ল্যাকমেইলিং করা। মেজর জেনারেল জিয়ার সহযোগিতায় মোবাইল ট্র্যাকিং করে শামসুজ্জামান ও তার ছেলে সাদমান জামানের মধ্যকার আলোচনার কিছু স্পর্শকাতর তথ্য, লন্ডনে থাকা ব্যাংক একাউন্টের তথ্য এবং ইজরায়েলি গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সাদমান জামানের সংযোগ থাকার মতো তথ্য খুঁজে পান ফজলে করিম চৌধুরী। এসব ব্যবহার করে চলতে থাকে মহাপরিচালক শামসুজ্জামানকে ব্ল্যাকমেইলিং, হুমকি-ধামকি ও দুদকের ভয়। আর ব্ল্যাকমেইলিংয়ের পরবর্তী ধাপ হিসেবে ওই সময়ে জাগো নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমসহ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে চলতে থাকা এই ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বিনিময়ে ফজলে করিম আদায় করে নেন ৩৬ কোটি টাকা মূল্যের কার্যাদেশ রেলওয়ের ডিজিটাল ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ। যা উদ্বোধনের দিন থেকে আজ অবদি এক দিনের জন্যও বাংলাদেশ রেলওয়ের কোনো কাজে আসেনি। উদ্ভোধনের পরপর বিগত ২ বছর হতে আজ অবধি অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে এই দুইটি ডিজিটাল ওয়াশিং প্ল্যান্ট। একটি ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয় ঢাকার কমলাপুরে এবং অন্যটি স্থাপন করা হয় রাজশাহীতে।

১২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করায় চট্টগ্রাম-৬ আসনের (রাউজান) সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

২০২৫ সালের ১৩ জুলাই দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক মো. নিজাম উদ্দিন বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন।

সেই মামলার এজাহারে  উল্লেখ করা হয়, অনুসন্ধানকালে আসামি ফজলে করিম চৌধুরীর নামে ১১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ ও ১২ কোটি ১৩ লাখ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদসহ মোট ২৪ কোটি ৮ লাখ টাকা মূল্যের সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। এই সম্পদ অর্জনের বিপরীতে তার ঋণ বা দায়-দেনার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

আয়কর নথি পর্যালোচনায়, সম্পদ অর্জনে তার বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া যায় ১৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ রেকর্ডপত্রের আলোকে তার বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয়ের তুলনায় ৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা মূল্যের সম্পদ বেশি পাওয়া যায়। যা তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ মর্মে প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়।

এছাড়া তিনি ১২টি ব্যাংক হিসাবে ১০৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকার অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের অবৈধ উৎস গোপন করার চেষ্টা করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের সেই মামলা এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর ছেলে ফারাজ করিমসহ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় নি।

 

আরো পড়ুন

মন্ত্রী জাবেদের বাসায় যত মুল্যাবান সম্পদ

নিজস্ব প্রতিবেদক :: আওয়ামী সরকারের আলোচিত সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের গুলশানের ফ্ল্যাটে আবারও অভিযান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের...

Read more
তেল নিয়ে সিন্ডিকেট, টিকে গ্রুপের ৫০০ কোটি মুনাফা, ৩২ কোটি জরিমানা

বিশেষ প্রতিনিধি ::: তেলের বাজার অস্থিতিশীল করে মাত্র দুই মাসে ভোজ্যতেলের সিন্ডিকেট করে ৪ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করেছে টিকে...

Read more
ফুটবল খেলা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে দশম শ্রেণির ছাত্রকে হাতুড়িপেটার অভিযোগ

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি :: গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ...

Read more
নোয়াখালীতে স্থানীয়দের ধাওয়ায় পিস্তল ফেলে পালাল যুবক

নিজস্ব প্রতিবেদক :: নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় স্থানীয়দের ধাওয়ার মুখে একটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও চার রাউন্ড গুলি ফেলে পালিয়ে গেছে...

Read more
চট্টগ্রামের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে টোল চুরির ‘ড্রাই রান’

বিশেষ প্রতিবেদক ::: চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিম আকরাম এলিভেটেট এক্সপ্রেসওয়ে টোল থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এই...

Read more
Scroll to Top