বিশেষ প্রতিবেদক :::
চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিম আকরাম এলিভেটেট এক্সপ্রেসওয়ে টোল থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এই চক্রটিকে টোল আদায়ে নিয়োজিত করেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমান। পিডি মাহফুজের নেতৃত্বে শাহ আমানত বিমানবন্দর সংলগ্ন টোলপ্লাজা থেকে টোলের অন্তত চল্লিশ কোটি টাকা (জুন মাস পর্যন্ত) লুটপাটের তথ্য মিলেছে অনুসন্ধানে।
২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করা হয়েছিল। তবে মূল অংশে পরীক্ষামূলকভাবে গাড়ি চলাচল শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে। আনুষ্ঠানিকভাবে টোল পরিশোধের মাধ্যমে গাড়ি চলাচল করছে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো অব রিসার্চ টেস্ট অ্যান্ড কনসালটেশনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজারের বেশি গাড়ি চলাচলের কথা এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে। যা থেকে বছরে টোল আদায়ের কথা ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা। প্রতিদিন ৩৯ হাজার গাড়ি চলাচলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হলেও , গড়ে চলাচল করেছে মাত্র ৮ হাজার করে। সম্ভাব্যতার তুলনায় যা মাত্র ২০ দশমিক ৬১ শতাংশ।
২০২৪ সালে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে প্রতিদিন ৭৭ হাজার ৪০১টি গাড়ি চলাচলের কথা ছিল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জহির উদ্দিন নামের একটি আওয়ামী লীগের দোসরকে টোল আদায়ের কাজে আন অফিসিয়াল দায়িত্ব দেন। এক যুগের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন টোল প্লাজায় লোকবল নিয়োগ করে টোল আদায় করেছে তমা কনস্ট্রাকশানের মালিক মালিকের ভাগিনা জহির। একসময় তমা কনস্ট্রাকশানের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করা জহির টোলের টাকা চুরিতে সিদ্ধহস্ত।
সুত্রমতে, চট্টগ্রামের এক্সেসরোড়) টোলপ্লাজা থেকে ২০২২ সাল থেকে বিভাগীয় পদ্ধতিতে ( টেন্ডার করা হয় নি) টোল আদায় করা হচ্ছিলো। সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমার সহযোগিতায় ( দৈনিক চুক্তি) টোল আদায়ে সফটওয়্যার ও লোকবল নিয়োগ করে জহির। সাদ্দাম হোসেন নামের একব্যক্তি ম্যানেজার হিসেবে দীর্ঘদিন ওই টোল আদায়ের কাজ তদারকি করে।
২০২৫ সালের শুরুতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হবার পর থেকে টোল আদায় করছেন টোলের লুটেরাখ্যাত জহির উদ্দিনের ম্যানেজার সাদ্দাম হোসেন।
এ বিষয়র জানতে প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তমা কনস্ট্রাকশানের কর্ণধার মানিকের ভাগিনা জহিরকে তিনি চেনেন না। তবে সাদ্দাম হোসেন নামের এক ব্যক্তি টোল আদায় তদারকি করছেন। প্রকল্পের কনসালটেন্ট জনবল নিয়োগ করেছেন। আমি কিছুই জানি না। ‘
প্রকল্প পরিচালক মাহফুজ দাবি করেন, ‘ টোল আদায় করার সফটওয়্যার ক্রয় করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। নিজস্ব সফটওয়্যারে টোল আদায় করা হচ্ছে। ‘
অনুসন্ধান ও হিসাব বিভাগের নথি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, কোন টোল সফটওয়্যার ক্রয় করেনি সিডিএ। ওয়াসিম আকরাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল আদায়ে মুলত তমা কনস্ট্রাকশানের সাথে সম্পৃক্ত জহিরের সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় একই সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে চট্টগ্রামের এক্সেস রোড় টোলপ্লাজায়। এটির ইজারাদার জহির উদ্দিন। ‘
ওই টোলপ্লাজায় টোল আদায় কাজ করেছেন এমন এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘ প্রতিদিন গড়ে ১৮-২০ লাখ টাকা টোল আদায় হয়। জহিরের সাথে চুক্তি অনুযায়ী পাঁচ লাখ টাকা (কম বেশি) সিডিএ’র একাউন্টে জমা দিয়ে আসেন ম্যানেজার সাদ্দাম। টোল চুরির টাকা থেকে প্রতিদিন অন্তত দশ লাখ টাকা পান প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমান। ‘
আরেকটি সুত্র জানিয়েছে, জহিরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় টোল আদায় বাবত চল্লিশ কোটি টাকার উপরে পকেটস্থ করেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমান। জহিরকে টেন্ডারে টোলপ্লাজা ইজারা দেবার বিষয়টিও চুড়ান্ত করে রেখেছেন মাহফুজুর রহমান। সম্প্রতি ওয়াসিম আকরাম এলিভেটর এক্সপ্রেসওয়ে টোলপ্লাজার দরপত্র আহবান করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী দরপত্রে ‘বেস্ট ইস্টার্ন ‘ নামের এই লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে অংশগ্রহণ করেছে তমা সিন্ডিকেটের অন্যতম কুশীলব জহির উদ্দিন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৭ মাস নিজস্ব জনবল দিয়ে টোল আদায়ের ( আসলে ঠিকাদার জহির) পর উড়াল সেতু দিয়ে পুরোপুরি গাড়ি চলাচল চালু হবার আগে টোলপ্লাজার দরপত্র আহবান করে ভবিষ্যতে রাজস্ব চুরির সুগভীর বন্দোবস্ত করেছেন মাহফুজ -জহির গং । গাড়ি চলাচল কম এমন যুক্তিতে কম দরে টোলপ্লাজাটি ইজারা দিয়ে সুক্ষ্ম টোল চুরির ছক এঁকেছেন তারা। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন প্রান্তে নির্মিত রাম্প চালু হলে এই উড়াল সেতু দিয়ে যান চলাচল অন্তত দশগুণ বেড়ে যাবে । জহিরের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাম্প চালুর আগেই দরপত্র আহবান করা হয়েছে।
ঢাকার অন্য একটি টোলপ্লাজা ইজারার সাথে জড়িত এক ব্যবসায়ী বলেন, এটা লুটপাটের খেলা। এতোদিন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জনবল দিয়ে টোল আদায় করেছে দাবি করলেও ; ছক অনুযায়ী পরবর্তীতে ( দরপত্র আহবান করা হলে) যে ঠিকাদার টোলপ্লাজার ইজারা পাবে (জহির) তারাই আসলে এতোদিন গোপনে টোলপ্লাজাটি পরিচালনা করে আসছে। এক্ষেত্রে যান চলাচল, দৈনিক আয় সম্পর্কে ইজারাদার ধারণা পাবে। একই সাথে দরপত্রে এতোদিনের অর্জিত ব্যবসায়ীক ধারনা অনুযায়ী কোটেশন দিয়ে টেন্ডারটি ভাগিয়ে নেবে।
তিনি বলেন, ওয়াসিম আকরাম এলিভেটেট এক্সপ্রেসওয়েতে টোলের টাকা চুরির মহোৎসব চলছে। প্রকল্প পরিচালকের সাথে দৈনিক ভিত্তিতে ( বর্তমান যান চলাচলের হারে) আভ্যন্তরীণ নেগোসিয়েশন করে ব্যবসায়িক সুবিধা নেবে এতদিন গোপনে টোল আদায়ের কাজ করা প্রতিষ্ঠানটি। যদিও রাম্প চালু হলে ভবিষ্যতে যান চলাচল দশগুণ বৃদ্ধি পাবে। তিন বছরে দেড়শো কোটি রাজস্ব হারাবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ‘
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট একটি সুত্র জানিয়েছে, গেল ১৭ মাসের টোল আদায়ের হিসেব অনুযায়ী এভাবে চলতে থাকলে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণব্যয় তুলতেই লেগে যাবে প্রায় ২২৫ বছরের বেশি।
জানতে চাইলে শাহ আমানত সেতুর পুরোনো এক ইজারাদার জানান, এটা লুটপাটের একটা গভীর ছক। সব ডিপার্টমেন্টেই চলে। বিভাগীয় পদ্ধতির নামে একই ঠিকাদার ডিপার্টমেন্টের সাথে দৈনিক চুক্তিতে কিছুদিন টোল আদায় করবে। পরে তারাই কোন ইজারাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে দরপত্রে অংশ নিয়ে ওই সেতু বা টোলপ্লাজার ইজারা ভাগিয়ে নেবে। ‘
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওয়াসিম আকরাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোলপ্লাজার ইজারার দরপত্র আহবান করে একবার রি টেন্ডার করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী দুই, তিন, চারবার কিংবা তার চেয়ে বেশিবার রি টেন্ডার করা হবে। যাতে ইজারা মুল্য সর্বোচ্চ ও যুক্তি সংগত হয়।
তিন মাসের বেশি সময় অনুসন্ধানে করে জানা যায় জহির উদ্দিন ( ফার্মের নাম বেস্ট ইস্টার্ন, ভিন্ন মালিক ) জনবল নিয়োগ করে টোল আদায় করে ‘টোল চুরির ড্রাই রান’ সম্পন্ন করেছে। প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমানের সাথে চুক্তি অনুযায়ী জহিরই এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোলের ইজারা পাবেন। ‘
সুত্রমতে, চট্টগ্রামের এক্সেস রোড়ের টোলপ্লাজায় দীর্ঘদিন সড়ক ও জনপদ বিভাগের সাথে টোল আদায়ের ‘ ড্রাই রান ‘ করেছেন তমা কনস্ট্রাকশানের মালিকের ভাগিনা জহির উদ্দিন। ২০২৩ সালে এ বিষয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগে লিখিত অভিযোগ জমা পড়লে বিপাকে পড়েন তৎকালীন নির্বাহী কর্মকর্তা পিন্টু চাকমা। জহিরের ম্যানেজার সাদ্দাম হোসেন ধরা পড়েন চ্যানেল ২৪ এর ক্যামেরায়। এই বিষয়ে চ্যানেল ২৪ এ অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রচারিত হয়েছিলো। গেল এপ্রিল মাসে বেস্ট ইস্টার্ন নামের একটি ফার্ম ব্যবহার করে টোলপ্লাজাটির ইজারা পেয়েছেন (সিএস) পেয়েছেন ‘ জহির উদ্দিন’। বর্তমানে জহিরের লোকজন এক্সেসরোড়ের টোলপ্লাজাটি পরিচালনা করছেন।
জানতে চাইলে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম বলেন, দেড় যুগ ধরে টোল চুরির কারণে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চুরির এই ছক সম্পর্কে জানলাম। এই বিষয়ে তদন্ত করে পুরো চক্র ধরা হবে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, টোল লুটপাটের পুরো বিষয়টি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে। দুর্নীতির হলে, রেজাল্ট পাবেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টোলচুরিতে সারাদেশে বড় একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিলো। বর্তমান সরকারের আমলে তাদের সুযোগ দেয়া হবে না। রাজস্ব থেকে রাস্ট্রকে বঞ্চিত করে কেউই পার পাবে না। ‘
অনুসন্ধান/ইউএনএন




