নিজস্ব প্রতিবেদক :::
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুরো চট্টগ্রাম যখন উত্তাল পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দু’জন সাংবাদিক আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক যিনি চট্টগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রাসেল আহমেদ ফেসবুক স্টাটাসে জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ করেছেন। তার স্টাটাসে তিনি লিখেছেন, “দেশে আবারো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজমান। জুলুমকারীরা কখনো দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। খুনি হাসিনা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
জুলাইয়ের স্মৃতিকথা :
ইভেন মীর ভাই পরামর্শ দিল রাজনীতি করতে আগ্রহী হলে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কন্টিনিউ করতে। কিন্তু আমি বেছে নিলাম আরো দীর্ঘ লড়াইয়ের পথ। আজ মনে হচ্ছে আমি ঠিক ছিলাম। বিএনপি হয়ে উঠছে জালেম।
আজ এক ঐতিহাসিক দিন। ৩১ জুলাই। মনে পড়ছে কোট বিল্ডিং চত্বরে জুলাই অগ্নিকন্যাদের বজ্রকন্ঠ স্লোগান এবং আইনজীবীদের ঢাল হয়ে পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতি। আমার ভীষণভাবে মনে পড়ছে আমাদের অভিভাবক হয়ে পাশে দাঁড়ানো পর্দার আড়ালের এক টেলিভিশন সাংবাদিকের সাহসী ভূমিকা।
৩১ জুলাই ২০২৪ কোর্ট বিল্ডিং চত্বরে প্রথম দেখা হয়েছিল মীর ভাইয়ের সাথে। পেশাদার একজন সাংবাদিক হলেও সেদিন তিনি ব্যক্তি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের (আমি,রাফি,রিদুয়ান সিদ্দিকী) পাশে দাড়িয়েছিল। দিনটি ছিল বুধবার। ইবেন মীর (চ্যানেল ২৪) ভাইয়ের অফিস বন্ধ ছিল। মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচি শেষে এক আইনজীবীর চেম্বারে উনার সাথে দেখা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে সাইফ ও আবরার আমাকে খুব সতর্কতার সাথে একজন আইনজীবীর চেম্বারে নিয়ে যান। এই পরিকল্পনা ছিল ইবেন ভাইয়ের। যখন চারিদিকে শত্রু ও কোথাও নিরাপত্তা পাচ্ছিলাম না তখন আইনজীবীর চেম্বারে আমার সাথে প্রথম দেখা হয়। খান তালাত মাহমুদ রাফির সাথে এই পরিকল্পনা রাতেই করা হয়েছিল।
কোন ধরনের পূর্ব পরিচায় ছাড়া কেন উনাকে আমরা বিশ্বাস করছি এই বিষয়টি নিয়ে মনে সংশয় তৈরি হলেও যেহেতু কাউকে না কাউকে বিশ্বাস করা জরুরী ছিল তাই রাফিও উনাকে মুঠোফোনের যোগাযোগ করতে করতে এক পর্যায়ে উনার প্রতি আস্থা রেখেছিল। দিনের বেলায় আইনজীবী ভবন থেকে বের হলে আওয়ামি সন্ত্রাসী গুম করে করবে ভয়ে সবাই সন্ধ্যে নামার অপেক্ষা করি।
আমাদেরকে কেউ যেন চিনতে না পারে সেজন্য ইবেন ভাই আইনজীবীদের সাদা পোশাক ম্যানেজ করে সন্ধ্যা নামার পর আমাকে এবং Ridwan Siddique কে নিয়ে একটা সিএনজি করে বাসায় পৌছে দেন। আর রাফিকে আইনজীবী রেজাউল ভাইয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেন। সেই থেকে উনার সাথে সম্পর্কের শুরু। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই আপনার পেছনে কারা আছে, উনি শুধু একটা কথাই বলেছিল আমাদের সাথে যা হচ্ছে তা উনি মানতে পারছেনা।
আমাদের আন্দোলন যৌক্তিক তিনি স্বেচ্ছায় আমাদের পাশে দাড়িয়েছেন। ৩২ জুলাই থেকে ৩৬ জুলাই আন্দোলনে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে কখন বের হবো, কিভাবে বের হবো, কোন পথ নিরাপদ এসব বিষয় উনি আমাদেরকে পরামর্শ দিয়েছিলেন । কারণ তিনি মাঠে সাংবাদিকতা করার কারনে নিরাপদ রুট জানছিলেন প্রতিনিয়ত।
মোবাইল পুরনো সিম ব্যবহার করছি শুনে উনি নিজের টাকায় আমার জন্য, রাফির জন্য এবং রিদুয়ান এর জন্য কয়েকটা সিম ব্যবস্থা করে দেন। এরমধ্যে মোবাইল নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা বললে Wahid Zaman ( সাংবাদিক) ভাইয়ের সাথে কথা বলে আমার জন্য এবং রিদোয়ানের জন্য দুটা মোবাইল ব্যবস্থা করে দেন। এর মধ্যে আর্থিক সংকটে পড়ে গেলে ইবেন ভাই ব্যক্তিগত জায়গা থেকে সাধ্যমত আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
এদিকে আমার আর রিদোয়ান সিদ্দিকীর পাশে অন্যদিকে সার্বক্ষনিক রাফি, মুজাহিদসহ অন্যদের খোঁজখবর আর সুবিধা-অসুবিধা দেখছিলেন। অবশেষে এলো সেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার রাত। ৪ আগষ্ট মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচিতে যোগদানের অপেক্ষা । রাফি মুজাহিদসহ কয়েকজনকে আইনজীবী রেজাউল ভাই ট্রাকে তুলে দেয়। আমার সাথে যোগাযোগ না হওয়ায় আমি বাদ পড়ে যাই। আমি আটকা পড়েছিলাম চকবাজার। সকাল ১১ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত। কেননা পুরো শহরে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীরা মহড়া দিচ্ছিল। আমাকে নিরাপদে নিউমার্কেট চত্বর থেকে সরিয়ে ইবেন ভাই চকবাজারে একটি হোটেলে নিয়ে যান। হোটেলটির সাংবাদিক ওয়াহিদ জামান ভাইয়ের পরিবারের।
সেদিন ৩৬ জুলাইয়ের প্রথম প্রথর। রাত ১২টা। ইতোমধ্যে ঢাকার উদ্দেশ্যে দেশ প্রেমিক ছাত্র জনতা রওনা দেওয়া শুরু করেছে । সে সময় কথা হচ্ছিল ইবেন ভাইয়ের সাথে। আমি ঢাকা যাবার প্রবল আগ্রহ নিয়ে ইভেন ভাইকে যাওয়ার বন্দোবস্ত করার জন্য বার বার অনুরোধ করছিলাম। উনি বলেছিলেন, এয়ারের টিকিট খালি আছে তবে সেখানেও ঝুঁকি আছে। বিমানবন্দরে চেক করলে যদি গ্রেফতার হই। তারপরও ঝুঁকি নিলাম ভাইয়ের সাথে কথা বলললাম। বিমানের টিকিট ব্যবস্থা করে দিলেন। সেই টিকিট কাটার পরপরই আবার সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে খুনি হাসিনা। টিকিট কেনার পর আর কোনভাবেই যোগাযোগ হচ্ছিল না ইবেন ভাইয়ের সাথে।। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে সরাসরি মোবাইল নাম্বারেই কল দিয়ে জানালেন টিকিটের ব্যবস্থা হয়েছে। পরে ভিপিএন অন করে অনলাইনে টিকিট পাঠালেন তিনি। ভোরের আলো ফুটার আগেই আমাকে রেজাউল ভাই ( এডভোকেট রেজাউল ইসলাম) বাইকে করে বিমানবন্দর দিয়ে আসলেন। সেখান থেকে…………।
পরে ইবেন ভাই পরামর্শ দিল রাজনীতি করতে আগ্রহী হলে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কন্টিনিউ করতে। কিন্তু আমি বেছে নিলাম আরো দীর্ঘ লড়াইয়ের পথ। সে থেকে ভাইয়ের সাথে আমার কিছুটা দুরত্বও তৈরি হয়। তবে আমি এখনো মনে প্রানে বিশ্বাস করি কোনো বিপদের মুখে পড়লে তিনি আবার পাশে দাড়াবেন।
তিনি সরাসরি কোনো রাজনীতি করেননা, বিএনপির একজন কট্টর সমর্থক এবং ভোটার। পেশাগত জীবনে উনাকে কখনো দেখিনি ব্যক্তি মতামতের সাথে পেশাগত দায়িত্বকে মেলাতে। পেশাগত জীবনে সবসময় কাজকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
উনার ব্যক্তিগত ফেসবুক স্ট্যাটাস গুলোতে দেখলাম অনেকেই ব্যক্তিগত আক্রমন করে কমেন্ট করছেন। তাদেরকে বলবো মানুষের ভিন্নমত থাকতে পারে। সেই জায়গায় ইবেন ভাইয়ের স্ট্যাটাস গুলো হয়তো বিএনপির পক্ষে যায় এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বিপক্ষে যায়। সেই স্ট্যাটাস গুলো উনার পেশাগত জীবনের অংশ নয়। বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালীন এবং পরবর্তী সময়ে উনার পেশাগত জীবনে আমরা উনাকে সবসময়ই পাশে পেয়েছি।
অভ্যুত্থানকালীন সময়ে সংকল্পে এবং সংকটে একজন ইভেন মীরের মত গুটি কয়েক ব্যক্তি তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সেইসাথে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা মাঠে ছিলেন বলেই আমরা সফল হয়েছি।
নোট : অনেকেই বলেন আন্দোলনকালীন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আমাদেরকে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছে। দুই বছর পরে এসেও স্পষ্ট করে বলতে হচ্ছে আমরা আর্থিক সহযোগিতা পাইনি। যদি পেতাম নিতাম না। দেশপ্রেম সেদিন এবং আজ আমাকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটিতে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হিসেবে চট্টগ্রামের নেতৃত্বে ছিলেন রাসেল আহমেদ। পরবর্তীতে তিনি নাগরিক পার্টির (দক্ষিণাঞ্চল সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পান। খান তালাত মাহমুদ রাফি -রাসেল আহমেদ চট্টগ্রামে আন্দোলনের মাঠে দুই সেনাপতি হিসেবে পরিচিতি পান।
সমন্বয়কদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে চট্টগ্রামের চেরাগী মোড়ে ২৯ শে জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পুলিশের ভ্যানে তুলে দেয় দৈনিক আজাদীর প্রতিবেদক ঋত্বিক নয়ন। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর ঋত্বিক নয়নকে চাকরিচ্যুত করা হলেও চেরাগী মোড়ে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চ্যানেল আইয়ের চৌধুরী ফরিদ, বিডি নিউজের মিন্টু চৌধুরী, চট্টগ্রাম প্রতিদিনের হোসাইন তৌফিক ইফতেখার’সহ চট্টগ্রামের ১৭ জন সাংবাদিক পুলিশ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীদের সহযোগিতা করছিলো – তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় নি।
৩১ শে জুলাই চট্টগ্রামের কোর্ট বিল্ডিংয়ে মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় পেশাজীবিদের সংগঠিত করেন সিনিয়র সাংবাদিক ওয়াহিদ জামান। কোর্ট বিল্ডিংএ শীর্ষ সমন্বয়কদের গ্রেফতার এড়াতে কৌশলী পদক্ষেপ নেবার নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি।তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট কে আলম, চবি ছাত্রদলের সাবেক সহ সভাপতি এডভোকেট আইনুল কবির, এডভোকেট রেজাউল ইসলাম, এডভোকেট নাজমুল ইসলামসহ সাবেক ছাত্রনেতাদের নির্দেশনা দেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী সমন্বয়কদের জন্য আইনজীবীদের পোষাক প্রস্তুত রাখা ছিলো । আইনজীবীরা কর্ডন করে লালদিঘী মোড় থেকে পুলিশের ব্যারিকেড ডিঙিয়ে শিক্ষার্থীদের মিছিল কোর্ট বিল্ডিং চত্বরে নিয়ে যান।




