নিজস্ব প্রতিবেদক :::
আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জায়েদ নাজমুন নুরকে বদলির ঘটনাকে অতিরঞ্জিত অপতথ্য হিসেবে প্রচার করেছে কিছু গণমাধ্যম। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) পুলিশ সদর দপ্তরের এক প্রজ্ঞাপনে জনস্বার্থে বদলির কথা উল্লেখ করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের একই প্রজ্ঞাপনে তাকে ছাড়াও আরও চার পুলিশ পরিদর্শককে ডিএমপিতে বদলি করা হয়েছিলো। তাদের মধ্যে গাজীপুর, এসবি, পিবিআই ও ফরিদপুর জেলা পুলিশের একজন করে কর্মকর্তা রয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের জনস্বার্থে বদলির নির্দেশনাকে স্টান্ড রিলিজ হিসেবে প্রচার করেছে এসব গণমাধ্যম। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছিলো।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিএমপিতে গত ১৮ জুনের রদবদলের অংশ হিসেবে আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূরকে কোতোয়ালী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে তিনি সিএমপির লাইনওয়ে পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
কোতোয়ালি থানায় শক্তহাতে অপরাধ দমনে ভূমিকা রেখেছেন জায়েদ নুর। চট্টগ্রামে আইনজীবি আলিফ হত্যা মামলা থেকে নিজের নাম কাটানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন কথিত সাংবাদিক ‘আয়ান শর্মা ‘। সুত্রমতে, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আয়ান শর্মার নেতৃত্বে ওসি কোতোয়ালি জায়েদ নুরকে বিতর্কিত করতে আওয়ামী লীগের সহযোগীরা কাজ করেছে।
১৮ সেপ্টেম্বর কাজীর দেউড়ি থেকে লালখান বাজার এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা মিছিল বের করেন। ওই সময় কোতোয়ালী থানার ওসি নাজমুন নূর নগরের দ্যা কিং অব চিটাগং ক্লাবে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে আতিথেয়তা করছিলেন—এমন একটি অতিরঞ্জিত অপতথ্য সামনে আনেন বিতর্কিত নিউজ পোর্টাল ‘ চট্টগ্রাম প্রতিদিন ‘। এই অনলাইন পোর্টালের উপদেষ্টা সম্পাদক ‘ আয়ান শর্মা ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিছিল হিসেবে প্রচার হলেও এটি ছিলো ইস্পাহানি মোড় থেকে চট্টগ্রাম ক্লাবের গেট পর্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন সড়কে দশ থেকে ১২ জন যুবকের স্বল্প সময়ের দৌড়। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এই মিছিলকে সফলতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে ফ্যাসিবাদের চিহ্নিত দোসররা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও পরিকল্পিত সমালোচনা শুরু করে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামে এসে শুক্রবার দুপুরে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর স্ত্রী’সহ শাহ আমানত মাজারে জুমার নামাজ আদায় করেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয় নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল চলাকালে সাবেক মন্ত্রীর সাথে ফটোসেশন করছিলেন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জায়েদ নাজমুন নুর। প্রকৃতপক্ষে মিছিল করার চেষ্টা করে রাত পৌনে দশটার দিকে। আর দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আলী আব্বাসের ছেলের বিয়েতে ওসি জাহেদ নুর যোগ দেন রাত এগারোটায়। তখন সেখানে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর স্ত্রী’সহ উপস্থিত ছিলেন। খাবার টেবিলে ওসির ছবি ব্যবহার করে অপপ্রচার করে চট্টগ্রাম প্রতিদিন।
এসময় চট্টগ্রাম ৮ আসনের সাংসদ এরশাদউল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। বিয়ের অনুষ্ঠানের শেষ সময়ে ( রাত এগারোটা) যোগ দেন চট্টগ্রাম -১০ আসনের সাংসদ সাইদ আল নোমান, নগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ আহমেদ উল আলম রাসেল।
জানতে চাইলে উপস্থিত আরেক বিএনপি নেতা এসকে খোদা তোতন বলেন, ‘ লালখানবাজারে নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিলের কথা জেনেছি দশটার দিকে। আর কোতোয়ালির ওসি আসলেন রাত এগারোটার পরে। ‘
চট্টগ্রাম প্রতিদিনের ফটোকার্ডে উল্লেখ করা ছবিতে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ( সদ্য ডিএমপিতে বদলি হওয়া) জায়েদ নুরের পোষাক পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শিরা জানান, ভিন্ন পোষাকে বিয়েতে যোগ দিয়েছিলেন ওসি।
এদিকে, ঢাকার গুলশান এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিলকে কেন্দ্র করে ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে একটি অডিও ফাঁসের ঘটনায় পার্শ্ববর্তী ক্যান্টমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও প্রত্যাহার করা হয়। স্পর্শকাতর এ দুটি থানার জন্য উপযুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জায়েদ নাজমুন নুর নির্বাচিত করে পুলিশ সদর দপ্তর। সুত্রসতে, অন্তত এক সপ্তাহ আগের সিদ্ধান্ত মতে ২১ সেপ্টেম্বর জায়েদ নুরকে বদলি করে ডিএমপি যোগ দেবার নির্দেশনা দেয়া হয়।
অথচ জনস্বার্থে জায়েদ নুরের বদলিকে পূর্বের ওই মিছিল ও একটি ছিনতাইয়ের ঘটনার সাথে মিলিয়ে অপতথ্য ছড়ানো হয় অনলাইনে। দায়িত্ব পালন না করে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের সাথে ছবি তোলার কারণে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বদলি এমন তথ্যও ছড়ানো হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের অধিকাংশ কর্মকর্তা যখন ফ্যাসিস্ট সরকারের তল্পিদার হিসেবে কাজ করছিলো, তখন জায়েদ নুর ( ডিবির ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন) সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালীন চট্টগ্রামের হাটহাজারী রোডে ৪টি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ ও গাড়ি পোড়ানোর ঘটনা ঘটে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল অভিযুক্ত লেগুনাচালক সোহেল রানাকে ডিবি পুলিশ ( জায়েদ নুর) গ্রেপ্তার করার পর সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় এবং এই নাশকতার পেছনে শ্রমিক লীগ নেতা দিদারুল আলমের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ করে। পরবর্তীতে পুলিশ হাটহাজারী থানায় দায়ের করা মামলায় শ্রমিক লীগ নেতা দিদারুল আলমকে গ্রেপ্তার করে। শ্রমিক লীগ নেতাকে গ্রেফতার, পুরো অভিযান ও জবানবন্দি নিয়ে লুকানো সত্য উদঘাটন করেছিলেন ওসি জায়েদ নুর।
জানতে চাইলে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক রাসেল আহমেদ বলেন, ‘ শ্রমিক লীগ নেতার নির্দেশে ৪ বাসে আগুন দিয়েছিলো শ্রমিক লীগ নেতা। তার দায় চাপাতে চেয়েছিলেন আন্দোলনকারীদের ওপর। ২০২৪ জুলাই আগস্ট সারাদেশে এমন ঘটনাই ঘটেছিলো। উন্মোচিত হয়েছে একটি ঘটনা। ‘
পুলিশ সদর দপ্তরের সুত্রমতে, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাহসী ভূমিকার কারণে অন্য পুলিশ কর্মকর্তা থেকে আলাদা উচ্চতায় পৌঁছে যান জায়েদ নুর। সদর দপ্তরের সুত্রমতে, গুলশান থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জায়েদ নাজমুন নুরকে পদায়ন করার তথ্য জেনে পদায়নের পূর্বে তাকে নিয়ে সমালোচনা তৈরি চেষ্টা করেছে একটি পক্ষ। তাকে নিয়ে অপতথ্য ছড়িয়ে কিছু গণমাধ্যম আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। মুল উদ্দেশ্ ছিলো সাবেক ছাত্রদল নেতা জায়েদ নাজমুন নুরকে যেন শুলশান থানায় পদায়িত করা না হয়।
সাবেক ছাত্রদল নেতারাই কেন টার্গেট ?
ঢাকা মহানগর শাখার সাবেক ছাত্রনেতা জায়েদ নুরকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা মহানগরে তিনটি কমিটির নেতা ছিলেন জায়েদ নাজমুন নুর। তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের সাবেক নেতারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিএনপি সরকারের ছয় মাস চলে গেছে। এর আগে দায়িত্ব পালন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। দুই আমলেই প্রশাসন থেকে শেখ হাসিনার দলবাজ পুলিশ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিতে ব্যাপক রদবদল, বাধ্যতামূলক অবসর ও ওএসডি করা হয়েছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে পুলিশে কর্মরত সাবেক ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সাইট করে রাখা হয়েছিলো। পুরো সময়ে পুলিশে জামাত সমর্থকদের জয়জয়কার ছিলো।
সুত্রমতে, বর্তমান সরকারের প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’ করে পদোন্নতিসহ বাগিয়ে নিচ্ছেন ওসি/এসপির চেয়ার। তবে ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়িত থাকা বা পদ পদবিকে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা পোস্টিং এর ক্ষেত্রে অচ্ছুত হিসেবে অবমুল্যায়িত হচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দুষ্কৃতকারী ও স্বার্থান্বেষী মহল’ পুরোনো ও বানোয়াট বিষয় সামনে এনে বিএনপিপন্থী ও নিরপেক্ষ পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের হেয় করার চেষ্টা করছে। জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে ।
সুত্রমতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং পুলিশ বাহিনীকে একটি নিরপেক্ষ কাঠামোতে রূপ দিতে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের মতো প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে এর মধ্যেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে বঞ্চনাবোধের কারণে পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।



