নিজস্ব প্রতিবেদক :::
সারাদেশের বিভিন্ন সেতুর টোল থেকে বড় অংকের রাজস্ব আদায় করে । তবে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সাবেক মন্ত্রী ও নেতাদের অবৈধ আয়ের লোভনীয় খাত হয়ে দাঁড়ায় টোলের রাজস্ব। সারাদেশে টোলের রাজ্যে গড়ে উঠে ‘শেখ রেহেনা সিন্ডিকেট ‘। আধুনিক টোল ব্যবস্থাপনার নামে এই সিন্ডিকেট সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব লুটে নেন বিগত সরকারের আমলে । ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও নানা কৌশলে অনেক টোল প্লাজার ইজারা ধরে রেখেছে একই সিন্ডিকেট । বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসলেও দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস সড়ক ও সেতুর টোল আদায় করছে বিগত সরকারের সময়কার সুবিধাভোগী কম্পানিগুলো ।
অনুসন্ধানে জানা যায় , সম্প্রতি মেঘনা-গোমতি সেতুর টোল নিয়ন্ত্রনে সব ফর্মালিটিজ সম্পন্ন করেছে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আমিনুল হক শামীমের ‘ শামীম এন্টারপ্রাইজ প্রাঃ লিঃ । সুত্রমতে, মেঘনা-গোমতি সেতুর টোল আদায়ের জন্য ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ’ কে কার্যাদেশ দেবার বিষয়টি চুড়ান্ত করা হয়েছে ।
নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল আদায়ের চুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগ এনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার অন্যান্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ওবায়দুল কাদের ও আনিসুল হক। টোলের রাজ্যে ওবায়দুল কাদের ও মির্জা আজমের ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত সিআইপি শামীম। সেই সুবাধে বিদেশ যাত্রায় শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হতেন শামীম।
এছাড়া প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, সচিব এম এ এন ছিদ্দিক, অতিরিক্ত সচিব মো. ফারুক জলিল, উপসচিব মোহাম্মদ শফিকুল করিম, প্রকৌশলী মো. ফিরোজ ইকবাল, ইবনে আলম হাসান, মো. আফতাব হোসেন খান ও মো. আব্দুস সালামও ওই মামলার আসামি।
মেঘনা গোমতি সেতুর টোলের ইজারা কিভাবে আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল হক শামীমের কাছে ফিরছে এই বিষয়ে অনুসন্ধান করে জানা যায়, এক যুগের বেশি সময় ধরে টোলখাতের লুটকৃত টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। শেখ রেহেনা হতে শুরু করে মির্জা আজম, ওবায়দুল কাদেরসহ সাবেক সরকারের বেশ কিছু মন্ত্রীর অবৈধ টাকায় গড়ে তোলা হয়েছে পাঁচতারকা হোটেল ‘রয়েল টিউলিপ, সি পার্ল বীচ রিসোর্ট’ এবং ত্রি-স্টার হোটেল ‘সি ক্রাউন’।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পুরোনো সিন্ডিকেটকে সেতুর টোল ইজারায় ফেরাতে অভিনব কৌশল নিয়েছে সড়ক ও জনপদ বিভাগ। সড়ক ও জনপদ বিভাগের একটি টেন্ডারের দরপত্র আহবানের তথ্য বিশ্লেষন (টিডিএস ) করে দেখা যায় , সেখানে আগ্রহী টোল দরদাতাদে যোগ্যতা হিসেবে ২০ বছরের টোল আদায়ের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে । সেই সাথে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ ৫ বছরের টার্ণ ওভার চাওয়া হয়েছে । প্রশ্ন হলো যেই কোম্পানিগুলো CNS, UDC, SEL এর দাপটে গতো ১৭ বছর দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে পারে নাই এবং পারলেও আওয়ামী লীগ সরকার এর প্রভাব খাটিয়ে যোগ্যতা থাকা সত্বেও কার্যাদেশ দেওয়া হয় নি ; তাহলে ওই সকল কোম্পানি সর্বশেষ ৫ বছরের ( ২০২০ সাল থেকে) টার্নওভার কিভাবে দিবে?
সড়ক ও জনপদ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান , সুক্ষভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে উঠা শেখ রেহেনা সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে এমন শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে । যেহেতু এক যুগের বেশি সময় ধরে সেতু ইজারার টেন্ডারে বিএনপি সমর্থক কোন ব্যবসায়ী কিংবা আওয়ামী বিরোধী কোন প্রতিষ্ঠান অংশই নিতে পারে নি , এসব প্রতিষ্ঠান অভিজ্ঞতা ও টার্ণ ওভারের শর্তপুরণ করতে পারবে না । অথবা ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও সর্বশেষ ৫ বছরের ভিতরে টার্ণওভার দেখাতে ব্যর্থ হবে। সর্বশেষ সেতু ইজারার সাথে জড়িত না থাকার কারণে সর্বশেষ ৫ বছর বিএনপি সমর্থিত ব্যবসায়ীরা টার্ণওভার দেখাতে পারবে না – স্বাভাবিকভাবে বিগত সরকারের সময়কার প্রতিষ্ঠানগুলোই ইজারাদার হিসেবে নির্বাচিত হবে ।
যদিও ২০২৫ সালের নতুন গেজেট অনুযায়ী, এটি CPTU-এর ওয়েবসাইটের উল্লেখিত পিপিআরে ( পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ) প্রতিযোগিতামুলক দরপত্রে অংশ নেওয়ার প্রাক যোগ্যতা হিসেবে ২০ বছরের অভিজ্ঞতার বিষয় সম্পর্ক কিছু বলা হয় নি ।
অনুসন্ধানে জানা যায় , আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সাবেক বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী জামালপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা আজমের নিয়ন্ত্রণাধীন ইউডিসি কনস্ট্রাকশন এরআগে মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল নিয়ন্ত্রণ করতো । কোম্পানিটি দলীয় ক্ষমতার জোরে একটানা ১৭ বছর রূপসা সেতু, লালন শাহ সেতু, হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ এবং কর্ণফুলী সেতুর টোল নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এখনো কোম্পানিটি নামে বেনামে দেশের বেশ কয়েকটি সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্বে রয়েছে । ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ’ নামের প্রতিষ্ঠানটিতেও সাবেক মন্ত্রী মির্জা আজম ও শেখ রেহেনার অংশীদারিত্বের কথা সংশ্লিষ্টদের সবারই জানা । এক দশক ধরে যে কয়টি প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন টোল ইজারার সাথে জড়িত ছিলো সবগুলোই শেখ রেহেনার গোপন অংশীদারত্বে পরিচালিত হতো।
দাপ্তরিক সুত্রমতে ,আওয়ামী শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছর সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এবং গুম-খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানসহ আওয়ামী লীগ নেতারা লুটপাটের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেছিলেন । জুলাই বিপ্লবের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেও প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে এখনও আওয়ামী লীগ নেতারা অবৈধভাবে নিজেদের কোম্পানির মাধ্যমে টোল আদায়ের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, এবং প্রতিনিয়ত টোল থেকে আয়কৃত টাকার সিংহভাগ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাদের পাঠাচ্ছে যেটা দিয়ে নেতারা আয়েশি জীবন যাপন করছে। এছাড়াও এই কোম্পানিগুলো তাদের আয়কৃত টাকা থেকে গোপনে ফেসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার এর বিভিন্ন নেতাকর্মীকে ডোনেশন করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া , সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কোম্পানি কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস) দলীয় প্রভাব খাটিয়ে কোন ধরনের টেন্ডার ছাড়াই দেশের ইতিহাসে ডিপিএম পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়ে ২৪ শতাংশ রেশিওতে যমুনা সেতুর টোল আদায় করে আসছিলেন । গত এক যুগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অন্তত পাঁচ ধরনের কাজ বাগিয়ে নিয়েছিলো সিএনএস। ওই সময়ে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব লুটপাট করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। সুত্রমতে , এই কোম্পানিটি অন্তবর্তী সরকারের সময়ও ভৈরব, ঘোড়াশাল ও লেবুখালী সেতুর টোল নিয়ন্ত্রণ করেছে।
বিএনপি সরকারের আমলেও দৃশ্যপটে নিজেদের দাপট ধরে রেখেছে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক শামীমের শামীম এন্টারপ্রাইজ। সুত্রমতে, শামীম এন্টারপ্রাইজ ও মির্জা আজমের ইউডিসি কনস্ট্রাকশন বড় বড় টোল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মগবাজার উড়াল সড়ক, ঢাকা বাইপাস সড়ক নির্মাণ, বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বাসের বিশেষ লেন (বিআরটি) নির্মাণসহ অসংখ্য প্রকল্প করায়ত্ত করে।
গুম-খুনে জড়িত জিয়াউল আহসানের কোম্পানি পেন্টা গ্লোবাল নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানও বিগত সময়ে বিভিন্ন টোল ইজারার সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্তমান অন্তর্র্বতী সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন চুপচাপ থাকলেও একই প্রতিষ্ঠান তারা বিভিন্ন সেতুর দরপত্রে অংশ নিচ্ছে।
জানতে চাইলে টান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ দুর্নীতিবাজ চক্র একই সুতোয় বাঁধা। ক্ষমতার পরিবর্তন তাই দুর্নীতিবাজদের কোন ক্ষতি করতে সক্ষম হয় না । দেড় দশক ধরে টোল আদায়ের নামে হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। ‘
মেঘনা গোমতি সেতুর টোল ইজারা চুড়ান্তকরন প্রক্রিয়া কিংবা ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ’ সড়ক ও জনপদ বিভাগের ওপেন সিক্রেট। এ বিষয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগের কোন কর্মকর্তা মুখ খুলতে নারাজ।
এই সেতুর টোল নিয়ে দুর্নীতির মামলায় আরও বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত একই সেতুতে যৌথভাবে এমবিইএল-এটিটি কোম্পানিকে টোল আদায়ের দায়িত্ব দিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৫ কোটি টাকার কিছু বেশি। পরবর্তীতে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড তিন বছরের জন্য ৬৭ কোটি টাকায় চুক্তি পায়, যা পাঁচ বছরের হিসাবে প্রায় ১১২ কোটি টাকা দাঁড়ায়।
এই তুলনায়, সিএনএস লিমিটেডকে একক উৎসভিত্তিক চুক্তি দেওয়ার কারণে সরকারের অন্তত ৩০৯ কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছিলো।
ওবায়দুল কাদের ও মির্জা আজমের আশির্বাদে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বহুতলবিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবন, উড়াল সেতু, আন্তর্জাতিক মানের ৫ তারকা হোটেল, আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতালসহ বিভিন্ন মেগাপ্রকল্পের নির্মাণের কাজ করেছে শামীম এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড (এসভপিএল) সম্পন্ন করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীদের ব্যবসায়িক পার্টনার শামীমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি আবারও দেশের প্রধান প্রধান সেতুগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং ই-টোল আদায়ের দায়িত্বে ফিরে আসছে।
Logo
ফটো গ্যালারি
ই-পেপার
জাতীয়
আরও দেখুন
Traffic & Route Planners
Civil Engineering
Communications & Media Studies
Tourist Destinations
Politics
সাবেক আইনমন্ত্রীর কোম্পানি সিএনএসের চুক্তি বাতিল টোল আদায়ের নতুন টার্গেট ও পরিকল্পনা সরকারের
যমুনা সেতুর টোল আদায়ে চায়না কোম্পানি
Daily Inqilab স্টাফ রিপোর্টার
০২ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম | আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
30
Shares
facebook sharing buttonwhatsapp sharing buttoncopy sharing buttonsharethis sharing buttonmessenger sharing button
সারা দেশে ৬৭টি সেতু এবং চারটি সড়ক থেকে টোল আদায় করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস সড়ক ও সেতুর টোল এক সময় আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও নেতাদের অবৈধ আয়ের লোভনীয় খাত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আধুনিক টোল ব্যবস্থাপনার নামে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব লুটে নেন দীর্ঘ সময় ধরে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সেই লুটপাট এখনো কিছু সেতুতে অব্যাহত রয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পরও আওয়ামী নেতাদের মালিকাধীন কোম্পানিগুলো অদৃশ্য শক্তিতে এসব টোলপ্লাজায় বহাল তবিয়তে কাজ চালিয়ে আসছিলো। তবে দেশের অন্যতম বৃহৎ যমুনা সেতুর টোল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে আসছিলো সাবেক মন্ত্রীদের কোম্পানি ইউডিসি, সিএনএস, শামীম এন্টারপ্রাইজ, সেল ভান, রেগনাম, এটিটি এবং পেন্টা গ্লোবালের মতো প্রতিষ্ঠান। গত এক বছরে তাদের চুক্তি বাতিল করতে পারেনি সরকার। তবে দুদকের অভিযানের পর কিছু বাতিল করা হলেও এখনো অনেক সেতুতে টোল আদায়ের কাজে জড়িত রয়েছে। এ কারণে এসব সেতু থেকে বছরে টোল আদায়ের নতুন টার্গেট ও পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
আরও দেখুন
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সেবা
সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন
ইনকিলাব ম্যাগাজিন
রাজনৈতিক পডকাস্ট
দৈনিক সংবাদপত্র সাবস্ক্রিপশন
Advertisements
সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কোম্পানি সিএনএসের চুক্তি বাতিলে করে যমুনা সেতুর টোল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রোড ও ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) কোম্পানিকে দেয়া হয়েছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাতিল করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া চলমান বলে জানিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। গত আগস্ট মাসে সেই কোম্পানির চুক্তি বাতিল করে নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রোড ও ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) কোম্পানিকে ৫৯ কোটি ৬৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫০৪ দশমিক ১৪ টাকা মূল্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এতে কোম্পানি পরবর্তী পাঁচ বছর সেতুর টোল আদায় ও পরিচালনা কার্যক্রম তাদের নিজস্ব জনবল দ্বারা পরিচালনা করবে। কোম্পানিটি এখন থেকে অনলাইনে টোল আদায় করবে, এতে কমবে যানজট। আগামী পাঁচ বছর প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব জনবলে এই দায়িত্ব পালন করবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। গত ৩১ আগস্ট দায়িত্ব পেয়ে রাত ১২টা ১মিনিটে তারা সেতুর দায়িত্ব বুঝে নিয়ে দায়িত্ব পালন শুরু করে। এতে প্রাক্কলিত মূল্য থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা কমে দরদাতা হিসেবে চায়না রোড ও ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) যমুনা সেতুর টোল আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পায়।
এবিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের যমুনা সেতুর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন জানান, কম টাকায় দরপত্র দেওয়া হলেও টোল কমানোর কোনো সুযোগ নেই। সরকার নির্ধারিত টোল আদায় করতে হবে। ডিজিটাল সফটওয়্যারের মাধ্যমে টোল আদায় করা হবে। ফলে টোল আদায়ের কারণে কোনো যানজট সৃষ্টি হবে না। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের যুগ্ম সচিব আলতাফ হোসেন শেখ বলেন, ইতিমধ্যে কার্যাদেশ পেয়ে রাত ১২টার পর থেকে নতুন কোম্পানি টোল আদায় শুরু করেছে। প্রাক্কলিত মূল্য থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা সাশ্রয় মূল্যে পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা এবং সফটওয়্যারের মাধ্যমে টোল আদায় করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে গাড়ি পারাপার করা যাবে। এখানে অনলাইনে টোল দিয়ে যাতায়াতের জন্য প্রত্যেকটা লাইনে ব্যবস্থা থাকবে। ব্যবহারকারী যদি টোল কালেকশন সিস্টেমে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করেন, তাহলে টোল পারাপারের সময় তাঁরা অনলাইনে টোল দিতে পারবেন। সরাসরি টোলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকাটা জমা হয়ে যাবে। এতে টোলে কোনো ট্রাফিক জ্যাম হবে না। সরকারের ১৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। অন্যদিকে জনগণও কম সময়ে দ্রুততার সহিত টোল প্লাজা দিয়ে পার হয়ে যেতে পারবে। গত ২০১৮ সাল হতে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) ২০২৪ আগস্ট পর্যন্ত যমুনা সেতুর টোল আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল। দীর্ঘ ছয় বছর পর এবার বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিল সরকার।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছর সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এবং গুম-খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানসহ আওয়ামী লীগ নেতারা টোলখাতে লুটপাটের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। জুলাই বিপ্লবের পর স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলেও প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে আওয়ামী লীগ নেতারা অবৈধভাবে নিজেদের কোম্পানির মাধ্যমে টোল আদায়ের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলো সাবেক মন্ত্রীদের কোম্পানি ইউডিসি, সিএনএস, শামীম এন্টারপ্রাইজ, সেল ভান, রেগনাম, এটিটি এবং পেন্টা গ্লোবালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সংশ্লিষ্ট এসব কোম্পানির এত ক্ষমতা ছিল যে, তাদের বিষয়গুলো কখনোই সঠিকভাবে অডিটও করা হয় নি। তারা টোল কালেকশন করে ৫০ শতাংশ জমা দিত আর ৫০ শতাংশ লুটপাট করত।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কোম্পানিগুলোর ভারতীয় পার্টনার ভ্যান ইনফ্রার সহযোগিতায় টোল খাতে লুটপাটের সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছিলো।
নথি অনুযায়ী, সারা দেশে ৬৭টি সেতু এবং চারটি সড়ক থেকে টোল আদায় করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। এসব সেতু থেকে বছরে টোল আদায়ের একটা টার্গেট থাকে সরকারের। ২০২২-২৩ অর্থবছরে টোল আদায়ের টার্গেট ছিল এক হাজার ৩৫০ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের টার্গেট ছিল এক হাজার ২৮৭ কোটি এবং ২০২৪-২৫ চলতি অর্থবছরে এই টার্গেট বাড়িয়ে করা হয় দুই হাজার কোটি টাকা।




