ইরানে চলমান অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভের মধ্যেই প্রায় সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ওয়েব মনিটরিং প্রতিষ্ঠান ক্লাউডফ্লেয়ার ও নেটব্লকসের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে হঠাৎ করেই দেশটির ইন্টারনেট ট্রাফিক নাটকীয়ভাবে কমে যায়। যা স্পষ্টভাবে একটি পরিকল্পিত শাটডাউনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মূলত ইরানের মুদ্রা রিয়ালের আকস্মিক অবমূল্যায়ন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। কয়েকদিন ধরেই তেহরানসহ বড় বড় শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে শুরু করলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে তেহরানের ঐতিহ্যবাহী বাজার এলাকাগুলোতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বহু দোকান বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যবসা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিরাপত্তাজনিত শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
এই অবস্থার মধ্যেই ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে এক ধরনের ‘ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট’ নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ যেমন বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছেও ইরানের ভেতরের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেটব্লকস জানিয়েছে, ইরানের জাতীয় নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর মাধ্যমে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে সরকার চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই দেশের বড় অংশের ইন্টারনেট ট্রাফিক বন্ধ বা সীমিত করতে পারে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া এই সংযোগ বিচ্ছিন্নতা সেই ব্যবস্থারই একটি বাস্তব উদাহরণ বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা।
যদিও এখন পর্যন্ত ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেয়নি, তবে দেশটির ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষই এর জন্য দায়ী বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতীতেও বিক্ষোভ দমনে একই কৌশল গ্রহণ করেছে তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারনেট বন্ধ করে সরকার মূলত তিনটি লক্ষ্য অর্জন করতে চায়:
১. বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যোগাযোগ সীমিত করা
২. আন্দোলনের ভিডিও ও ছবি বিদেশে ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো
৩. আন্তর্জাতিক চাপ ও সমালোচনা কমিয়ে আনা
তবে এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনলাইন ব্যবসা, ব্যাংকিং সেবা, শিক্ষা কার্যক্রম, চিকিৎসা সংক্রান্ত যোগাযোগ—সবকিছুই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ইরানের অনেক ফ্রিল্যান্সার ও অনলাইন উদ্যোক্তা ইতোমধ্যেই বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে জানা গেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ইন্টারনেট বন্ধ করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আগেও ইরানের এই ধরনের কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, ইন্টারনেট একটি মৌলিক অধিকার এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার অজুহাতে তা বন্ধ করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন।
এটি প্রথমবার নয়।
২০১৯ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সময় ইরান প্রায় এক সপ্তাহের জন্য পুরো দেশকে ইন্টারনেটবিচ্ছিন্ন করেছিল। তখন হাজারো মানুষ নিহত ও গ্রেপ্তার হয়, অথচ বাইরের বিশ্ব সঠিক তথ্য পেতে পারেনি। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাই এখন নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের সাধারণ জনগণ একদিকে অর্থনৈতিক চাপে, অন্যদিকে তথ্য বিচ্ছিন্নতার কারণে মানসিক চাপের মধ্যেও রয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা নিজেদের কণ্ঠ বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে পারছে না, যা আন্দোলনের গতি ও আন্তর্জাতিক সংহতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের এই ইন্টারনেট শাটডাউন কেবল একটি প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি রাজনৈতিক অস্ত্র। সরকার এটি ব্যবহার করছে নাগরিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখার হাতিয়ার হিসেবে।
সব মিলিয়ে, উত্তাল ইরানে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও সংকটপূর্ণ করে তুলেছে। অর্থনৈতিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক ক্ষোভ ও ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট—এই তিনের সমন্বয়ে দেশটি এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।




