নিজস্ব প্রতিবেদক ।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে নিয়ন্ত্রন ধরে রাখতে কালুরঘাট ফেরীর ইজারা প্রক্রিয়া বন্ধে আইনী প্রতিবন্ধকতা তৈরির কুটকৌশল নিয়েছেন বোয়ালখালী আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি, বালু সিন্ডিকেটের মাফিয়া খ্যাত মনসুর আলম পাপ্পী । আমরিন এন্ড ব্রাদাস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক পাপ্পী ৫ই আগস্টের পর থেকে কানাডায় পালিয়ে আছেন । ২০২৩ সালে কালুরঘাট ফেরির ইজারা নেবার পর বিভিন্ন ব্যক্তি থেকে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব বিক্রির কথা বলে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেবার অভিযোগ মাথায় থাকা ফেরারী পাপ্পী কর্ণফুলী নদীতে বালি-ইয়াবা-অস্ত্র ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবার ব্যবহার করছেন আদালতের গুটি ।
জানা গেছে, কালুরঘাট সেতু সংস্কার কাজ চলাকালীন ছয় মাসের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে ২০২৩ সালে চালু করা কালুরঘাট ফেরিঘাটটি নিয়ন্ত্রনে রাখতে আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা পাপ্পি ।
তিন বছরের মেয়াদউর্ত্তীন্ন হবার আগে গত ৩০ শে এপ্রিল ফেরির দরপত্র আহবান করে চট্টগ্রামের সড়ক ও জনপদ বিভাগ । ইজারাদার আমরিন এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার পরিচয়ে এক ব্যক্তি আদালতের শরনাপন্ন হন । আদালত রুল জারি করার পাশাপাশি দরপত্র আহবান প্রক্রিয়ার উপর ৪ সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন । আদালত থেকে স্থগিতাদেশ আসার খবরে ফেরিঘাট ইজারায় বিনিযোগকারীরা ( আওয়ামী লীগ নেতা পাপ্পীকে টাকা দিয়েছেন ) তাদের বিনিয়োগ ফেরত পেতে বিক্ষোভ করেছেন । পাপ্পীর ফেরী ইজারার এক পার্টনার জানান, কোন টাকা বিনিয়োগ না করেই ক্ষমতার দাপটে ৫৪ শতাংশ শেয়ার ভোগ করত পাপ্পী, অন্যদের নামমাত্র লভ্যাংশ দিত। মনগড়া হিসাব করে টাকা আত্মসাৎ করত। প্রতারণার মাধ্যমে ফেরি ইজারার পার্টনারদের কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
তবে সড়ক ও জনপদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন , আইনী প্রক্রিয়ায় আদালতের স্টে ব্যাকেন্ট করা হবে । দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কালুরঘাট ফেরিটি সিন্ডিকেট মুক্ত করা হবে ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় ২০২৩ সালে কালুরঘাট ফেরির ইজারা প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই নজিরবিহীন দুর্নীতি বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে শিরোনাম হয় । ২০২৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কালুরঘাট সেতু মেরামত কাজ শেষ করে সেতু চালু করার পরিকল্পনা নেয় রেলপথ মন্ত্রণালয় । জনসাধারনের বিকল্প চলাচলের পথ হিসেবে কালুরঘাট সেতু নিচে ফেরি চালুর বিষয়টি নিয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপর ছিলো বাড়তি চাপ । কথা ছিলো সেতু মেরামতের কাজ শুরু হলে সেতু দিয়ে সকল ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। তখন ভারী যানবাহন ছাড়া অন্যান্য সব যানবাহন এই ফেরি দিয়ে চলাচল করবে। ওই বছর টেন্ডার প্রক্রিয়ার প্রথম তিন দফায় টেন্ডারে কোন প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়ায় পরপর সাতদফা টেন্ডার আহবান করে সড়ক ও জনপদ বিভাগ । ২ সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েও আমরিন এন্টারপ্রাইজকে ইজারা পাইয়ে দিতে সহযোগিতা সড়ক ও জনপদ বিভাগের ততকালীন সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী। টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরীর সাথে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে আওয়ামী লীগ নেতা মনসুর আলম পাপ্পী ঘোষণা দিয়েছিলেন কালুরঘাট ফেরির ইজারা পাচ্ছেন তিনি ।
চট্টগ্রামের দু:খখ্যাত কালুরঘাট সেতু সংস্কার কাজ চলাকালীন সেতুর নিচ দিয়ে ফেরি চলাচলে সরকারী অর্থ লুটপাট মহাপরিকল্পনা থামাতে পারে নি কেউই। সাতবার টেন্ডার আহবান করার পরও সর্বোচ্চ দরদাতা নয়, দলীয় প্রভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাই দেয়া হয়েছিলো এই ফেরিঘাটের ইজারা । ফেরিঘাট নিয়ন্ত্রনে রাখতে এত আগ্রহের নেপথ্য কারণ কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন ব্লকে অবৈধ বালুরমহাল , ইয়াবা ও অস্ত্র ব্যবসার নিয়ন্ত্রন হাতে রাখা ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় , ২০২৩ সালের ২৪ শে আগস্ট টেন্ডার খোলার পরদিন থেকেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা আমরিন এন্টারপ্রাইজকে ইজারাদার হিসেবে সিএস দেওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করে সড়ক ও জনপদ বিভাগের ততকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা। এই বিষয়ে ২০২৩ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান মাহফুজ এন্ড ব্রাদার্সের মালিক মাহফুজ আহমেদ। দরপত্র মুল্যায়ন দীর্ঘায়িত করা, বার বার রি টেন্ডার করার অভিযোগ করে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর আইনী নোটিশও দিয়েছিলেন তিনি ।
মাহফুজ আহমেদ বোয়ালখালী বিএনপির নেতা । দুদকে জমা দেয়া অভিযোগ অনুযায়ী দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা হবার পরও আমরিন এন্ড ব্রাদার্স নামের একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের অনূকূলে ‘ সিএস ‘ দেবার জন্য হাতে হাত রেখে সুপারিশ করেছেন তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুহাইব আহমেদ, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম) আতাউর রহমান, তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জাহিদ হোসেন, নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা।
অভিযোগ বলা হয় বোয়ালখালী আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি মনসুর আলম পাপ্পিকে সেতুর ইজারা দেবার জন্য কোন প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডারে অংশ নিতে দেয়া হতো না । ৬ ষ্ঠ দফায় মনসুর আলম পাপ্পীর প্রতিষ্ঠান টেন্ডার জমা দেন । ২য় সর্বোচ্চ ঠিকাদার হয়েও তিনিই বাগিয়ে দেন ফেরির ইজারা । অথচ প্রথম সর্বোচ্ছ দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে সেতুটির ইজারা দিলে দশ লক্ষ টাকা ( আমরিন ইন্টারপ্রাইজের চেয়ে ) বেশি রাজস্ব পেত সরকার ।
বিতর্কের মুখে সড়ক ও জনপথ বিভাগ চট্টগ্রামের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন , ফেরি সার্ভিস চালু না হলে তো সেতুর সংস্কার কাজ শুরু করা যাবে না। হয়তো লাভ হবে না মনে করে কেউ অংশ নিচ্ছে না। এরপরও টেন্ডারে যদি কেউ অংশ না নেয় তাহলে আমাদের ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে চালানো হবে। “
৫ই আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতা মনসুর আলম পাপ্পি কানাডা পালিয়ে গেলে ইজারা বাতিল করে ফেরিঘাট দখল মুক্ত করার দাবিতে ২০২৫ সালের ৩০ আগষ্ট মানববন্দন করেন এলাকাবাসী । নতুন করে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হবার পর পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তির ম্যানেজারের আদালতের দ্বারস্থ হওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে আলোচনা সমালোচনা ।
লাভজনক না হবার কারণে যে ফেরিঘাটের টেন্ডারে অংশ নিচ্ছিলো না কোন প্রতিষ্ঠান । মেয়াদ শেষ হবার পর সেই ফেরির ইজারার টেন্ডার বন্ধ করতে ততপর হয়ে উঠেছে আওয়ামী সিন্ডিকেট । গত ৩০ শে এপ্রিল চট্টগ্রামের স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক পূর্বকোনে কালুরঘাট ফেরি ইজারার টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে আওয়ামী লীগ নেতা পাপ্পীর মালিকানাধীন আমরিন এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার দাবি করে ১১ ই মে জনৈক আরিফুল ইসলাম হাইকোর্টে রিট ( রিট নং- ৫৯৭৭) দায়ের করেন । আদালত রুল জারি করে রুলটি ৪ (চার) সপ্তাহের মধ্যে জবাবে নির্দেশনা দেন । সেই সাথে রুলটির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত, ৩০ শে এপ্রিলে প্রকাশিত বিঞ্জপ্তিতে উল্লিখিত ঘাটটি ইজারা দেওয়ার বিষয়টি ১৮ ই সেপ্টম্বর পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় ২০২৩ সালে তিন বছরের মেয়াদে ইজারা দেয়া ফেরির ইজারা মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই । সড়ক ও জনপদ বিভাগকে বেকায়দায় ফেলতে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা মনসুর আলম পাপ্পীর নামে এমন রুল আবেদন জমা দেয়া হয় ।
দুদকে অভিযোগ দেয়া ব্যবসায়ী মাহফুজ আহমেদ বলেন, সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী যে ফেরির ইজারা নেবার জন্য শুরু থেকে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানই মিলেনি, সেটির দর আমরা প্রতিযোগিতায় থাকার কারনে দুই কোটি পঁচিশ লাখ টাকা উঠেছিলো। অথচ এক কোটি সাত লাখ টাকায় ফেরি ঘাটের ইজারা দেবার বিষয়টি সেসময় পঞ্চম দফা টেন্ডার আহবানের পর নিশ্চিত করা হয়েছিলো। সওজ কর্মকর্তাদের লুটপাটের ছক পাল্টে যাবার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা তৃতীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে ( আমরিন) সামনে এনে সিএস প্রদানের চক্রান্ত করেছেন। এতে রাস্ট্রের অন্তত দশ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়। ‘
অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে, বিগত সরকারের আমলে কালুরঘাট ফেরি ঘাটটি ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে। সংশ্লিষ্ট সুত্র অনুযায়ী , মাহফুজ এন্ড ব্রাদার্সের মালিক মাহফুজ আহমেদকে (বিএনপি নেতা ) দৈনিক বিশ হাজার টাকা সড়ক জনপথ চট্টগ্রাম কার্যালয়ে দেবার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো ৷ সড়ক ও জনপথ বিভাগ চট্টগ্রামের তৎকালীন তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জাহিদ হোসেন ও নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা, সহকারী প্রকৌশলী সেগুন প্রসাদ বড়ুয়ার উপস্থিতিতে এমন অনৈতিক প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো। সুত্রমতে, দরপত্রে অংশ নেয়া এক ঠিকাদারের দুই কোটি দশ লাখ টাকার দর কেটে এক কোটি চুয়ান্ন লাখ টাকা বসানোর পরামর্শও দিয়েছেন তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা। ওই প্রতিষ্ঠান নিশ্চিতভাবে ইজারা পাবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক কোটি চুয়ান্ন লাখ টাকা দর প্রস্তাব করা হয়েছিলো । “
ফেরিঘাট ইজারার টোল থেকে দৈনিক বিশ হাজার টাকা অফিসকে দেবার প্রস্তাব এবং দরদাতার প্রস্তাব পরিবর্তন করে এক কোটি চুয়ান্ন লাখ বসানোর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন ওই দপ্তরে কর্মরত দুই কর্মচারী। সুত্রমতে, তখন আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রভাবের কারণে লুটপাটের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে পারে নি । বোয়ালখালী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মসলেম উদ্দিন চৌধুরীর মেয়েকেও ফেরিঘাটের শেয়ার দেয়া হয়েছিলো । প্রয়াত সংসদ সদস্য মোসলেম উদ্দিন চৌধুরীর ব্যবসায়িক পার্টনার ছিলেন মনসুর আলম পাপ্পী । এমপির মেয়ে সুমিকে পার্টনার করে অবৈধ কার্যক্রমের বৈধতা নিয়েছিলেন চট্টগ্রামের বালু মহালের একসময়কার মাফিয়া ডন মনসুর আলম পাপ্পী ।
আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে কালুরঘাট ফেরিঘাটের নিয়ন্ত্রন বজায় রাখতে মরিয়া মনসুর আলম পাপ্পীর বিষয়ে গত বছরের মাঝখানে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবরে লিখিত আবেদন করেছিলেন নাঈমুর রহমান রাব্বি নামের এক জুলাইযোদ্ধা। মন্ত্রণালয়ের বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, পলাতক মনসুর আলম পাপপী একজন আওয়ামী লীগের দোসর, সে বহু খুনের মামলার আসামী। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাব খাঁটিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ জাল ও তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে স্ব-পরিবারে কানাডার ভিসা পায়। ২০২৪ সালের জুলাই ছাত্র আন্দোলনের গণ অভ্যুথানের সময় আন্দোলনকারী ছাত্র জনতার উপর গুলি চালায় পাপ্পী, তার গুলিতে আহত হয় রাববী। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে আপোষ মীমাংসা করার জন্য কানাডা থেকে অনেক হুমকি ধমকি প্রদান করেন।




