রাহাতুল ইসলাম রাহাত ::
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কালনী এলাকার একটি বাড়ি বাড়া দিয়ে মাদক,ডিজে পার্টির ব্যবসা করে আসছিলেন পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির। সোমবার মধ্য রাতে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরের বাড়িটিতে অভিযান চালিয়ে ৮৪ জনকে আটক করে। মঙ্গলবার এক অফিস আদেশে পুলিশ সদরদপ্তরের রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখা থেকে ক্লোজড করা হয়েছে অতিরিক্ত ডিআইজি (সুপারনিউমারারি) আব্দুল্লাহ আল জহিরকে।
রিপেয়ার এন্ড মেনটেইনেন্স শাখা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে । এ তথ্য নিশ্চিত করেছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স।
নথি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন থেকে পুলিশ সদর দপ্তরের সিআইডি, স্পেশাল ব্রাঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন জহির। আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী হিসেবে ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে বিপিএম, পিপিএম পদকও পেযেছিলেন। সিকিউরিটি এন্ড ইন্টেলিজেন্স শাখার বিশেষ পুলিশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আওয়ামী লীগ পন্থী পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে সুসম্পর্কের পুরস্কার হিসেবে অতিরিক্ত ডিআইজি পদোন্নতি পান জহির।
সুত্রমতে, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সারাদেশের মাদক ব্যবসায়ীদের শেল্ডার দিতেন জহির। সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম ও অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় জোযারদারের সাথে মাদক ব্যবসায় হাত পাকান অতিরিক্ত ডিআইজি জহির। ঢাকা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত মাদকের এই সিন্ডিকেটের ছায়া। উদ্ধার হওয়া ইয়াবা সোর্স মানি হিসেবে কিনে আবার বিক্রি করা হতো মাদক ব্যবসায়ীদের কাছেই।
সোমবার রাজধানীর পূর্বাচলের রূপগঞ্জের কালনী এলাকায় অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের মালিকানাধীন একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মাদকসহ ৮৫ জনকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আটকদের মধ্যে ২৬ জন নারী ও ৫৯ জন পুরুষ রয়েছেন। অভিযানে মদ, সিনথেটিক মাদক, সিসা ও বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম এই অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানান।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, বাড়িটিতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ মাদক সেবন ও ডিজে পার্টির আসর বসে আসছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালানো হয়। অনলাইনে এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলারের মাধ্যমে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হতো বলেও জানান তিনি। গত সোমবার রাতে শুরু হওয়া এই অভিযান মঙ্গলবার পর্যন্ত চলে।
সুত্রমতে, তিন লাখ টাকা চুক্তিতে বাড়িটি ভাড়া দেযার তথ্য প্রমাণ দেখাতে পারেন নি অতিরিক্ত ডিআইজি জহির। অতিথি সেবার সাইনবোর্ডের আড়ালে মুলত মাদকের চালানের হাত বদল করা হতো ফ্লাটটিতে। ডিজে পার্টির জমজমাট আয়োজন জমে উঠতো নিজস্ব উৎসে ইয়াবার সহজলভ্যতা ও পুলিশি নিরাপত্তার কারণে।
অভিযানে মদ, সিনথেটিক মাদক, সিসা ও বিয়ার উদ্ধার করা হলেও মাদকের সুনির্দিষ্ট ধরন ও পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ওই বাড়িতে তল্লাশি ও আলামত সংগ্রহের কাজ চলে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির জানান, ট্রাভেলারসহ বিভিন্ন ধরনের মানুষ অস্থায়ীভাবে থাকা কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠান করার জন্য নিয়ম মেনে বাড়িটি ভাড়া নেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এভাবেই বাড়িটি ভাড়া দিয়ে আসছেন। জহিরের দাবি, গত সোমবার রাতের জন্মদিনের পার্টি আয়োজনের জন্য বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। ভাড়ার শর্তে মদ, ওয়াইন এবং যেকোনো ধরনের মাদক ও অবৈধ কার্যকলাপ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘বাড়িটির ৫টি শয়নকক্ষে সাধারণভাবে সর্বোচ্চ ১০ জন অতিথি রাত কাটাতে পারেন। অতিরিক্ত বিছানার ব্যবস্থা করে সেখানে সর্বোচ্চ ২০ জনের থাকার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ১০ জনের বেশি অতিথির জন্য জনপ্রতি ৮ ডলার অতিরিক্ত ফি এবং প্রবেশের সময় প্রত্যেক অতিথির জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের কপি জমা দেওয়ার শর্ত রয়েছে। দিনের বেলায় পারিবারিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য সর্বোচ্চ ৪০ জন অতিথি আসতে পারবেন বলেও নিয়মে বলা আছে। এই অবস্থায় কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রম হয়ে থাকলে, তার দায় সম্পূর্ণ যারা বাড়িটি ভাড়া নিয়েছেন তাদের।’
তবে সোমবার রাতের পার্টিতে কতজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং অতিথিদের পরিচয়পত্র যাচাই করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, এলাকাটি নিরিবিলি হওয়ার কারণে বেশ জমজমাট মাদকের আড্ডায় পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মাদক ব্যবসায়ীরা মাদকের চালান হাতবদল করতো এই ফ্লাটে। অনলাইনে বেশ কিছুদিন ধরেই এই গোপন আড্ডার প্রচারণা চলছিল। ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেখে দূরদূরান্ত থেকে ওই বাড়িতে জড়ো হন অনেকে। খবর পেয়ে সোমবার মধ্যরাতে ঝটিকা অভিযান শুরু করে ডিবির একটি দল।
মঙ্গলবার এক অফিস আদেশে অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরকে রিপেয়ার এন্ড মেনটেইনেন্স শাখা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে । আবদুল্লাহ আল জহির ২৪ তম বিসিএস পুলিশ কো অপারেটিব সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক। রূপগঞ্জের ভোলাবো ইউনিয়নে রিমঝিম পুলিশ হাউজিং নামের একটি আবাসন প্রকল্প করেছেন আবদুল্লাহ আল জহির। রিমঝিম হাউজিং নামের একটি আবাসন প্রকল্পে অংশীদারিত্ব রয়েছে আবদুল্লাহ আল জহিরের। মুলত পুলিশ হাউজিং, রিমঝিম পুলিশ হাউজিং প্রকল্পকে ঘিরে গোপন এই আস্তানা তৈরি করেছেন পুলিশ কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল জহির।



