নিজস্ব প্রতিবেদক ::
ভিডিও করে নিজের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন সিফাত আবদুল্লাহ নামের এক যুবক । প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার পরিবার নিয়ে কুরুচিপূর্ণ গালাগাল দেবার পর তাকে আটক করা হয়। সিফাত আবদুল্লাহকে আটকের পর তাকে মুক্তি দিতে জামায়াত ও এনসিপি নেতা কর্মীরা সরব হন। ৫ সেপ্টেম্বর লংমার্চের পথসভায় জামাতে ইসলামির আমির ডাঃ শফিকুর রহমানও সিফাতের মুক্তি দাবি করেছেন।
সম্প্রতি নিজের বাসায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তুলে সিফাত আব্দুল্লাহ নামে এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সর্বস্তরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা সিফাতকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভিযুক্ত সিফাত আব্দুল্লাহর পিতার নাম সিকান্দার আলী। গাজীপুর মহানগরীর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে তাদের দোতলা বিশিষ্ট বাড়িতে মোট ৩টি আবাসিক বিদ্যুৎ মিটার সংযোগ রয়েছে এবং বাড়িতে আরও ভাড়াটিয়া পরিবার বসবাস করেন।
কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যে ভিডিও তৈরি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গালাগালের পুরোটাই পরিকল্পিত। মুলত সিফাত আবদুল্লাহকে ব্যবহার করে লংমার্চের আগে গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ জনগণের সামনে ” ভোগান্তি কার্ড “ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে এগারো দলীয় জোট।
১১ দলীয় জোটের লংমার্চ ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে গেল বৃহস্পতিবার বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রধান নির্বাহী ও বার্তা প্রধানদের নিয়ে বৈঠক করেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাঃ শফিকুর রহমান। সুত্রমতে, এর দুইদিন আগে গত সোমবার ৩৮ টি গণমাধ্যমে বিদ্যুৎ-গ্যাস পরিস্থিতিকে চরম ভোগান্তি আকারে প্রতিবেদন তৈরির এজেন্ড বাস্তবায়ন করতে ( টিভি, পত্রিকা, অনলাইন) সাংবাদিকদের কাছে টাকা পৌঁছে দেয়া হয়। দুটি জনপ্রিয় গণমাধ্যমের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কর্মরত দুই ব্যক্তি পুরো বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব পান। তাদের একজন একটি জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশনের সিইও, সিনিয়র সাংবাদিক ( শিবিরের সাবেক সাথী ছিলেন) । অন্যজন আরেকটি টিভির প্রধান নির্বাহী হিসেবে কর্মরত ; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সাবেক সভাপতি ( শিবিরের সাবেক সদস্য )।
অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে দেশে আন্দোলনের মাঠ গরম করতে চায় বিরোধীদল। বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সিফাত আবদুল্লাহর ভিডিও তৈরিকে পরিকল্পিত বলছে সংশ্লিষ্ট সুত্রগুলো। তবে সিফাত ইস্যুতে সরকারের কঠোর ভূমিকার কারণে ভড়কে যায় এনসিপি-জামাতের নেতারা।
সিফাত আবদুল্লাহর করা অভিযোগের সত্যতা জানতে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাথে যোগাযোগ করে গণমাধ্যম কর্মীরা। তাদের দেয়া তথ্য, সরেজমিনে মিটার পরিদর্শন ও গ্রাহকের লেজার/বিল পর্যালোচনায় মিলেছে ভিন্ন চিত্র।
সিফাত আব্দুল্লাহ তার ভিডিওতে দাবি করেন, তিনি গত দুই মাসে (আগস্ট-জুলাই) প্রায় ১০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছেন এবং বিষয়টিকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরেন। পরবর্তীতে একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি আরও লিখেন-“এক মাসের বিদ্যুৎ বিল একটা পুরো পরিবারকে জিম্মি কইরা ফেলবো?”
তবে সরেজমিনে সিফাত আব্দুল্লাহর বাড়িতে গিয়ে বিদ্যুৎ মিটার পরিদর্শন এবং কাস্টমারের লেজার প্রিন্ট, গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দেয়া তথ্য পর্যালোচনা করে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সিফাত আব্দুল্লাহ যে বাড়িতে বসবাস করেন সেখানে একটি নয়, মোট তিনটি আবাসিক বিদ্যুৎ মিটার সংযোগ রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কোনো অভিযোগ বা দাবি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি মিটারের বিল আলাদাভাবে দেখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বাড়ির সবগুলো মিটারের ব্যবহার ও বিলের হিসাবও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
সরেজমিনে সিফাত আব্দুল্লাহ যে বাড়িতে বসবাস করেন, সেই বাড়ির তিনটি মিটারের মে, জুন, জুলাই ও আগস্ট ২০২৬ সালের বিদ্যুৎ ব্যবহার ও বিলের বিস্তারিত হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ভিডিওতে করা অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। তাদের একটি মিটারে (নং: S000433*7) চলতি বছরের মে ৪৫ ইউনিট ব্যবহৃত হয়েছে । যেটির বিল ৩১৭ টাকা। একই মিটারে জুন মাসের ব্যবহার করা বিদ্যুৎ এর পরিমাণ ৫০ ইউনিট, বিল ৩৪২ টাকা। জুলাই মাসে ১৫০ ইউনিটের বিপরীতে বিল ১,১৮২ টাকা। আগস্ট মাসে ৭৫ ইউনিটের বিল এসেছে ৫১৩ টাকা। চার মাসে মোট ব্যবহার করা ইউনিট ৩২০। চার মাসে মোট বিল দাঁড়িয়েছে ২,৩৫৪ টাকা।
আরেকটি মিটারে (মিটার নং: S000218*5) মে মাসে ২৫০ ইউনিটের বিল এসেছে ১,৮১২ টাকা। জুন মাসে ২০০ ইউনিটের বিপরীতে বিল ১,৫৮৪ টাকা।জুলাই মাসে ৪০০ ইউনিটের বিপরীতে বিল ৩,৫৯৪ টাকা। এছাড়া সর্বশেষ আগস্ট ২৮৫ ইউনিটের বিপরীতে বিল হয়েছে ২,৩৯৭ টাকা। এই মিটারে চার মাসে মোট ব্যবহার করা বিদ্যুৎ ১,১৩৫ ইউনিট। চার মাসে মোট বিল দাঁড়িয়েছে ৯,৩৮৭ টাকা।
পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দেয়া বিলের অনুলিপি অনুযায়ী সিফাত আবদুল্লাহর পরিবারের আরেকটি মিটারে (মিটার নং: S000424*7) মে মাসে ১২৫ ইউনিটের বিপরীতে বিল ৮৪৭ টাকা। জুন মাসে ১২০ ইউনিটের বিপরীতে বিল ৬৯০ টাকা। জুলাই মাসে ব্যবহৃত ২০৫ ইউনিটের বিপরীতে বিল ১,৬৩৩ টাকা। সর্বশেষ আগস্ট মাসে ব্যবহৃত ১৭৫ ইউনিট বিদ্যুৎ এর বিল ১,৩৬২ টাকা। চার মাসে এই মিটারে মোট ব্যবহার ৬২৫ ইউনিট। চার মাসে মোট বিল দাঁড়িয়েছে ৪,৫৩২ টাকা। অর্থাৎ, মে থেকে আগস্ট – এই চার মাসে তিনটি আবাসিক মিটার মিলিয়ে মোট ২,০৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে এবং মোট বিল এসেছে ১৬,২৭৩ টাকা।
গাজীপুর বোর্ড বাজার জোনাল অফিস থেকে কর্মকর্তারা সিফাতের বাড়িতে গিয়ে বাসায় ইলেকট্রিক পণ্যের প্রকৃত তালিকা সংগ্রহের কথা জানালে দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং গেইট বন্ধ করে দেন।
স্থানীয়রা জানান, সিফাত আবদুল্লাহ চালচলনে বেশ উগ্র। আগে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে পরিচত ছিলেন। ৫ ই আগস্টের পর দল পরিবর্তন করে ইনকিলাব মঞ্চে ডুকেন।
ইসমতআরা নামের এক প্রতিবেশী বলেন, ‘ একজন নাগরিকের সেবা ব্যাহত হলে বা অপ্রত্যাশিত কোন ঘটনা ঘটলে প্রতিবাদ করা যেতেই পারে কিন্তু সেটা অবশ্যই সুস্থ ভাষায় এবং সুষ্ঠু উপায়ে হওয়া উচিত। শিক্ষিত ছেলে মুখের ভাষা শুনে আমি বাকরূদ্ধ। ‘
সিফাত আবদুল্লাহকে পুলিশ হেফাজতে নেবার পর দেশের কিছু কিছু গণমাধ্যম পরিকল্পনা অনুযায়ী বিষয়টিকে নেতিবাচক হিসেবে প্রচার করে। লংমার্চ কেন্দ্রিক সংবাদ প্রচারে সিফাত আবদুল্লাহর মুক্তির বিষয়টি প্রচার করলেও বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সিফাত আবদুল্লাহর মিথ্যাচার নিয়ে কোন সংবাদ প্রচার করা হয় নি।



